বাংলায় বাউল গান-চর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘকালের পর্ব -০৪
সোহারাব হোসেনের গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে, বিশেষ করে মহারণ ও আরশি মানুষ উপন্যাসদুটির সঙ্গে, তাঁরা জানেন বাউল-ফকিরের লোকায়তিক জীবন-দর্শন ও সাধনা তাঁর একটি প্রিয় বিষয়। এর একটা বড় কারণ হয়তো তাঁর জন্মগত ভৌগোলিক পটভূমি। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চবিবশ পরগণার বশিরহাটের সাংবাড়িয়া নামে যে-গ্রামে তাঁর জন্ম, সেখানে এবং আশপাশের গ্রামে ফকিরদের বসবাস ছিল। নানা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে হয়তো এখনো আছে। এঁদের সঙ্গে সোহারাবের পরিচয় আবাল্য। তাঁদের বাড়ির কাছেই বাস করতেন পির মহম্মদ আলি ফকির। তাঁর ছেলে নূর মহম্মদ ফকির ছিলেন লেখকের ‘ঠাকুরদা-স্থানীয়’। তিনি লেখকের দুই জ্যাঠতুতো দাদা-দিদিকে দত্তক নিয়ে লালনপালন করেছিলেন। প্রতিবছর বোশেখ মাসে নূর মহম্মদের বাড়িতে দুদিনব্যাপী মহম্মদ আলি ফকিরের ‘উরুশ’ (ওরস) উপলক্ষে বিরাট ফকির সম্মেলন বসত। সাধন-ভজন-জেকের-গানে মাতোয়ারা হয়ে উঠত পুরো গ্রাম। বোঝার বয়স না হলেও সোহারাবের বালকমনে ফকিরিগান আবেশ সৃষ্টি করত। সেই আবেশ কীভাবে ধীরে ধীরে অবচৈতনিক প্রক্রিয়ায় তাঁর সত্তা দখল করে নেয় তা লেখকের নিজের বয়ানে শোনাই ভালো :
শৈশব-কিশোরের সেই আবেশ তারুণ্যে যৌবনে গাঢ়-ভালোবাসায় পর্যবসিত হয়। পরে-পরে সে-বাউলবোধ আমার জীবন-বিশ্বাস আর জীবন-দর্শনের নির্ণায়ক মাত্রা হয়ে দাঁড়ায়। বাউলের সৎ-স্বচ্ছ-শুভ্র-সুন্দর-সু-সুকুমার-নির্ভার-পবিত্র প্রবৃত্তিজয়ী পুণ্যতোয়া জীবনধারাকে আমার জীবনের দৈনন্দিনতার সঙ্গে অন্বিত করে ফেলি তখনই। ফলে একটা নির্ভার-নিরাসক্ত-আনন্দময় জীবনযাপনের পথে হাঁটতে শুরু করি। আজও সে প্রক্রিয়া সমানে বহমান – আজও জীবনযাপনের ঐ বিশ্বাসে আমি অটুট।