Type Here to Get Search Results !

বাংলায় বাউল গান-চর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘকালের পর্ব -০৬

 
বাংলায় বাউল গান-চর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘকালের পর্ব -০৬ 

বাউলের সাধনা সহজিয়া প্রেমের সাধনা। কাকে বলে সহজিয়া’? মানুষের সহজ ও স্বাভাবিক বৃত্তিকে অর্থাৎ কামপ্রবৃত্তিকে স্বীকার করে নিয়ে তাকেই সাধনপন্থা রূপে গ্রহণ করাই সহজিয়া-তত্ত্ব। স্বাভাবিকভাবেই তাই এই সাধনায় সঙ্গী-সঙ্গিনীর প্রয়োজন হয়। সহজিয়া সাধকের মতে, কাম ছাড়া প্রেম নেই। কিন্তু একশ্রেণির সাধক আছেন যাঁরা সঙ্গী-সঙ্গিনী ছাড়াই প্রেম-সাধনা করেন। বোঝাই যাচ্ছে এই সাধনায় স্ত্রী-পুরুষে রমণ নেই। সোহারাব হোসেন মনোহর দাসের একটা গান উদ্ধৃত করেছেন যার চতুর্থ স্তবকে বলা হয়েছে

কেবল স্ত্রী-পুরুষে রমণ করা নয়
আত্মায় আত্মায় রমণ হলে রসিক তাকে কয়
তারা শুধু আত্মাকে ভেদ করিয়ে সদাই
লক্ষ্য পানে দেয় হানা।

সঙ্গী-সঙ্গিনীবিরহিত আত্মায়-আত্মায় যে-রমণের কথা এই গানে বলা হয়েছে, কারা সেই পন্থি সে-ব্যাপারে সোহারাব কিছু বলেননি। বললে ভালো হতো। এবং সেইসঙ্গে সুফি-সাধনার
কথাও তিনি বলতে পারতেন। কেননা, সুফির প্রেমসাধনা রতিনির্ভর প্রেমসাধনা নয়। বাউলতত্ত্বের সঙ্গে সুফিতত্ত্বের কয়েকটি জায়গায় গভীর মিল রয়েছে। সুফিতত্ত্বও গুরু বা পির-মুর্শিদনির্ভর, এখানেও রয়েছে দম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ, সুফিরও লক্ষ্য নিজের মধ্যেই পরমকে পাওয়া অর্থাৎ বাউলের সেই খোদ-এ-খোদাতত্ত্ব। এ-দিকটা ভেবেই এ-লেখার গোড়ায় আমরা বলেছি যে, সুফিদেরও বাউল ভাবতে অসুবিধা নেই।
আসলে বাউলতত্ত্ব ও সাধনায় নানা তত্ত্বদর্শন ও করণক্রিয়ার মিশ্রণ ঘটেছে। ভূমিকায় সোহারাব ইতিহাসসম্মতভাবে এ-সম্পর্কে সুন্দর করে বলেছেন,

বাউল-ধর্ম একক-মৌলিক ও নতুন কোনো মতপথ নয়। বাউল একটি মিশ্র-পন্থা। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত দেহ-সাধনা-কেন্দ্রিক অনেক মতপথের স্রোত এসে বাউল নামের বড়ো গাঙে এক-প্রবাহে চলছে। লোক-বাংলায় প্রচলিত ও অনুশীলিত ভাবের মাতনে পাগল হওয়া মানুষজন, বায়ু তথা শ্বাসের সাধনে অভ্যস্ত মানবগোষ্ঠী, সুফিবাদে বিশ্বাসী আউলিয়া সম্প্রদায়, খোদা-প্রেমে মাতোয়ারা বাতাল-সাধক সম্প্রদায়, বৌদ্ধ সহজিয়া বজ্রকুল গোষ্ঠী, বৈষ্ণব-সহজিয়া-কর্তাভজা-কিশোরীভজন গোষ্ঠী, নাথ-যোগী-সম্প্রদায়, মুসলমান ফকির কিংবা হিন্দুতান্ত্রিক-সমাজের আচার-ক্রিয়া-মতাদর্শ-বিশ্বাসের সমন্বয়ে-মন্থনে-রসায়নে সৃজিত পাল্টা জীবনযাপনের খাতে একদা বাংলায় বাউল-মতপথের উদ্ভব হয়েছিল।

এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার ধারণা করা যায়, বাউল বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর নাম নয়, একটি বিশেষ তত্ত্ব বা দর্শনের নাম। সেজন্য শুরুতে আমরা বলেছি যে, সোহারাব হোসেন তত্ত্বগত দিক থেকে বাউল শব্দটিকে বৃহত্তর অর্থে গ্রহণ করেছেন। এদের যেহেতু নানা গোষ্ঠী আছে সেজন্য তাদের মধ্যে বিচিত্র ধরনের দীক্ষাদান, সাধনপদ্ধতি ও আচারক্রিয়া প্রচলিত রয়েছে। ধারণ করা অর্থে ধর্ম শব্দটি যদি গ্রহণ করা হয় তাহলে বলা যাবে, বাউল একটি ধর্মও বটে।

লোক-সমাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠী গুরু-পরম্পরায় দীর্ঘ কাল ধরে একে বহন করে চলেছে। নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হলেও এদের লক্ষ্য এক হওয়ায় স্বরূপত এরা অভিন্ন। সেজন্য এরা যে-পন্থানুসারী, তাকে সহজেই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যময় পন্থা বলা যেতে পারে। সেই পন্থার সারকথা হলো কামজয়ী-প্রবৃত্তিজয়ী নির্ভার-নিরাসক্ত-মহাসুখ
মহাতৃপ্তি-মহানন্দময় জীবনের অধিকারী হওয়া।বাউলের সেই

অন্বিষ্টকে যথাসম্ভব সহজ-সরলভাবে মূর্ত করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে এ-গ্রন্থে।

Source: kaliokalam.com


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies