Type Here to Get Search Results !

বাংলায় বাউল গান-চর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘকালের পর্ব -০৮


বাংলায় বাউল গান-চর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘকালের পর্ব -০৮

সাধনার অন্যান্য ধারাও চন্দ্র সাধনা, বিন্দু সাধনা, লতা সাধনা, দর্পণ সাধনা ইত্যাদি ধারা সম্পর্কে প্রথম অধ্যায়ে বেশ বিসত্মারিতভাবে প্রাসঙ্গিক গানসহযোগে আলোচনা করা হয়েছে। বোঝা যায় লেখক প্রচুর বাউলগানের মর্মার্থ অনুধাবন করে সেগুলোর কিছু কিছু প্রয়োজন অনুযায়ী সাধনার বিভিন্ন ধারার সঙ্গে অন্বিত করেছেন। যেমন বিন্দু সাধনা। এই সাধনায় বিশেষ বৈষ্ণব দর্শনের সুস্পষ্ট প্রভাব আছে। এই ধারার বাউল বিশ্বাস করেন, সোহারাব লিখেছেন,

নারীদেহে থাকে রাধাবিন্দু এবং পুরুষদেহে কৃষ্ণবিন্দু।
দুটি বিন্দুই আধা অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ নয়। কেননা, বাউলদের একাংশ মনে করে কৃষ্ণবিন্দু থেকে রাধাবিন্দুর সৃষ্টি। অর্থাৎ পূর্ণ কৃষ্ণবিন্দু থেকে খত হয়ে রাধাবিন্দুর সৃষ্টি হওয়ায় তা খত। অর্থাৎ অর্ধ। বিন্দু সাধনায় এই দুই অর্ধবিন্দু নির্দিষ্ট যোগ ও নিয়ম মেনে মিলিত হলে পুনঃ পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়। পুনঃ পূর্ণতাপ্রাপ্ত এই রাধাবিন্দু-কৃষ্ণবিন্দুর মিলনে সাধক/ সাধিকা সূক্ষ্মতম মহানন্দের অনুভবে নির্ভার হয় যা বাউল-সাধনার লক্ষ্য।
রাধাবিন্দু আসলে স্ত্রী-রজঃ, আর কৃষ্ণবিন্দু পুরুষের বীর্য। বিচিত্র সাধনায় এ-দুটিকে মিলিয়ে যার সন্ধান পাওয়া যায় বাউলের ভাষায় সেই হচ্ছে মনের মানুষ, মনু রায়, অচিন পাখি, আলেক সাঁই ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। একে পেলে মহাসুখ, মহানন্দ লাভ করা যায়। কিন্তু দুই অর্ধবিন্দুকে পূর্ণতায় পরিণত করা কঠিনসাধ্য, আর্জান শাহ তাঁর একটি গানে যাকে কালার সঙ্গে বোবার মিলন বলেছেন, সোহারাব যেটি ৫৭ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত করেছেন।

সহজ বাউল পড়ে আমাদের পক্ষে যা অনুধাবন করা সম্ভব হয়েছে তা হচ্ছে, বাউলদের মধ্যে যাঁরা সহজিয়াপন্থি তাঁদের সাধনা আসলে বস্ত্ত রক্ষার সাধনা। বস্ত্ত বলতে তাঁরা রজঃ ও বীর্যকে বোঝেন। এই দুই বস্ত্তর মিলনেই মনুষ্য সৃষ্টি। আর এই দুই বস্ত্ততে আরো যেসব উপাদান বা বস্ত্ত (ম্যাটার) আছে, দেহ একদিন তাতেই বিলীন হয়ে যাবে। দুদ্দু শাহের একটি গানে এ-কথাই বলা হয়েছে বলে ধারণা করি : বস্ত্তকেই আত্মা বলা যায়/ আত্মা কোনো অলৌকিক কিছু নয়।/ বিভিন্ন বস্ত্তর সমন্বয়ে/ আত্মার বিকাশ হয়ে/ জীবন রূপ সে পেয়ে জীবনেতে রয়।/ অসীম শকতি তার/ যে তাহার করে সমাচার/ সাধিয়া ভবের কারবার বস্ত্ততে হয় লয়।
বাউল সাধনা কামের মধ্য দিয়ে কামকে অতিক্রম করে প্রেমের ফুল ফোটানোর সাধনা। তার জন্য নির্ধারিত আচার-প্রক্রিয়া আছে। সোহারাব সেসবের কিছু কিছু যতটা সম্ভব সহজ করে বলার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু ওই পর্যন্ত। ওর চেয়ে বেশি কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কেননা প্রক্রিয়াটি ব্যবহারিক। তাছাড়া তা গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে শিখতে হয় এবং সমস্ত কিছুরই প্রকাশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকে। সাধনায় সিদ্ধি লাভ হলে সাধকের দেহ-মন সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে নির্ভার-নিরাসক্ত-আনন্দময় হয়। বাউলের এর চেয়ে বেশি কিছু আর চাওয়ার নেই।
মনে হতে পারে বাউলের সাধনা আধ্যাত্মিক সাধনার ভিন্ন এক রূপ। তাঁরাও ঈশ্বরকে পেতে চান। কিন্তু এই মনে-হওয়া যে একেবারেই ঠিক নয় সে-সম্পর্কে সোহারাব স্পষ্টভাবে লিখেছেন,
বাউল-ফকিরি ধর্ম যতটা পরিমাণে পার্থিব আর মানবিক তার কণামাত্রও আধ্যাত্মিক নয়। বাউল ফকিরের
ভগবান-খোদা নেই, স্বর্গ-বেহেশত-নরক-দোজখ নেই, নেই কোরান-পুরাণ-বেদ-বাইবেল-ত্রিপিটক-গ্রন্থসাহেব। বাউলের শুধু আছে মানুষ, আছে জাতপাতহীন ভেদ-বৈষম্যহীন সমাজ, আছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, শিখ-জৈনাদি
নানান ধর্ম-ভেদ-বিরোধী জীবনদর্শন, আছে মানবমহিমা, আছে এক আলেক সাঁই তথা মনের মানুষ তথা একবীজ থেকে
সব-মানুষের জন্মতত্ত্বে বিশ্বাস। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষই তার সাধ্য মোক্ষ, … মানুষই তার আদম-কৃষ্ণ-মহম্মদ, মানুষই তার গয়া-কাশী, মানুষই তার মক্কা-বেনারস। বাউলের কাছে মানুষের দেহে-রূপে অরূপে-মহারূপে সব একাকার সেখানে কৃষ্ণ-হরি-চৈতন্যে আল্লা-আদম-মহম্মদে কোনো ফারাক নেই।
বাউলের সাধনায় তাই শুধু আত্মতত্ত্ব তথা মানুষতত্ত্বের সন্ধানই পাই না আমরা, সমাজতত্ত্বেরও চমৎকার প্রকাশ ঘটতে দেখি। বাউলের কাছে মানুষই যেহেতু সর্বসার, সেহেতু তার কাছে জাতপাত, ছোঁয়াছুঁয়ি, ঘৃণাবিদ্বেষ, এককথায় প্রবৃত্তিসম্ভূত কোনো রকম ভেদাভেদ ও অনাচার নেই। বাউলবিশ্ব তাই শামিত্মর বিশ্ব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানবমহিমায় একটি উচ্চতর রূপের কথা ভাবতেন। তাকে তিনি বলেছেন, মানবসত্তা, মহামানব ইত্যাদি। ইতিহাস জুড়ে এই মহিমা বা সত্তার বিনষ্টি আমরা দেখে চলেছি। কীভাবে ঘটে এই বিনষ্টি? রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, এই বিনষ্টি ঘটে তখন, যখন আমরা নিজেকে,
টাকায় দেখি, খ্যাতিতে দেখি, ভোগের আয়োজনে দেখি। এই নিয়েই তো মানুষের যত বিবাদ, যত কান্না। মানুষের মানবসত্তা সম্পর্কে এ ধরনের বিকৃত বোধই জাতিতে জাতিতে শত্র‍ুতা, শ্রেণীতে শ্রেণীতে সংঘাত, শোষণ অত্যাচার ইত্যাদি যাবতীয় জাগতিক সমস্যার মূলে।
ফলে যে-সত্তার লালনে মানব-সমাজে রবীন্দ্র-কথিত একটি বৃহৎ ও গভীর ঐক্যগড়ে উঠতে পারত, তা সম্ভব হলো না ওইসব তামসিক প্রবৃত্তির বিরাট হাঁ-করা মুখে রসদ জোগাতে গিয়ে। বাউলের সাধনা ওইসব প্রবৃত্তিকে জয় করার সাধনা। প্রবৃত্তিজয়ী বাউল তাই ঐক্যবাদী তথা সাম্যবাদী। জাতপাত সম্পর্কে তাঁরা এমন প্রশ্ন তোলেন, এমন যুক্তি দেখান যার কোনো উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা জাতবিচারীদের নেই। কিন্তু কেবল জাতের কথা নয়, অন্য অনাচারের বিরুদ্ধেও তাঁরা কথা বলেন। যেমন লালন ফকিরের বিখ্যাত সত্য বল সুপথে চলগানের এই দুটি পঙ্ক্তি : পরের দ্রব্য পরের নারী হরণ কর না/ পারে যেতে পারবে না লালনের পারআর রবীন্দ্রনাথের মানবসত্তায় পৌঁছানো একই তাৎপর্যবাহী বলে ভাবা যেতেই পারে।
বাউলের সাধনায় যে একটি গভীর সমাজতত্ত্ব অন্তশায়ী হয়ে আছে, সোহারাব হোসেনের তা অবিদিত নয়। বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ের নামই তিনি দিয়েছেন বাউলের ভেদ-বৈষম্যহীন সমাজতত্ত্ব। প্রথম অধ্যায়ের কথা আগেই বলেছি। মোট সাতটি অধ্যায়ের অন্য অধ্যায়গুলোতে আছে বাউলের মানুষতত্ত্ব, মনের মানুষতত্ত্ব,
খোদ-এ-খোদাতত্ত্ব ও তাঁদের গানের কাব্যমূল্য বিচার। তত্ত্বগুলোকে প্রাসঙ্গিক গানের সাহায্যে যথাসম্ভব সহজ করে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এ-ও তো সত্য, ‘সহজিয়াহলেও এই গোপন ঘরের তালা খোলা আমাদের মতো আটপৌরে সংসারী মানুষের পক্ষে সহজ নয়। এদিকে লক্ষ্য রেখেই এ-লেখার শিরোনামে কাহ্নপাদের একটি পদ থেকে এই পঙ্ক্তিটি ব্যবহার করেছি : ভণ কইসেঁ সহজ বোলবা জায়।’ – বলো কেমন করে সহজ বলা যায়। তবে সোহারাব অনেকটা পেরেছিলেন। পেরেছিলেন, কেননা তিনি আর দশজনের মতো আটপৌরে ছিলেন না।
বইটিকে লেখক হ্যান্ডবুকহিসেবে গণ্য করতে চাইলেও দুই বাংলায় যাঁরা বাউলদের নিয়ে অন্তরের তাগিদে ভালো কাজ করেছেন সেগুলোর মধ্যে সহজ বাউল মর্যাদাপূর্ণ আসন পাবে বলেই আমাদের ধারণা।

Source: kaliokalam.com


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies